ঢাকা ০৯:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

দেশে কাঠের তৈরি একমাত্র মসজিদ

  • বার্তা কক্ষ
  • আপডেট সময় : ০৫:৩২:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মার্চ ২০২৪
  • ৩৬ বার পড়া হয়েছে

ছবি : সংগৃহীত

বরিশালের পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া থানার বুড়িরচর গ্রামে ১৯১৩ সালে নির্মিত হয় দৃষ্টিনন্দন একটি কাঠের মসজিদ। মূল নাম ‘মমিন মসজিদ’ হলেও স্থানীয়দের মাঝে ‘কাঠের মসজিদ’ নামেই প্রসিদ্ধ পেয়েছে। সম্পূর্ণ মসজিদ কাঠের তৈরি। এমনকি এতে কোনো লোহার উপাদান বা পেরেকও ব্যবহৃত হয়নি। লোহার পেরেকের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে কাঠের শলা। মসজিদটি দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, বিশ্বের একমাত্র কাঠের তৈরি দৃষ্টিনন্দন মুসলিম স্থাপত্য ও অনুপম নিদর্শন। সারা বিশ্বে এ ধরনের মসজিদ আর নেই বলে দাবি করেন স্থানীয়রা। পুরো কাঠের তৈরি আরেকটি মসজিদ ইরানের খোরাসানে থাকলেও তার বৈশিষ্ট্য কিছুটা ভিন্ন। এ ধরনের কাঠের তৈরি আরও একটি মসজিদ একসময় ভারতের কাশ্মিরেও ছিল; কিন্তু ১৮৮৫ সালের ভূমিকম্পে সেটি ধ্বংস হয়ে যায়। সে হিসেবে বলা যায় মমিন মসজিদ পৃথিবীর একক নিদর্শন।

দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন তৎকালীন পিরোজপুরের ধর্মপ্রাণ যুবক মৌলভী মমিন উদ্দিন আকন্দ। তার পৌত্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ রচিত ‘মমিন মসজিদ; স্মৃতি বিস্মৃতির কথা’ গ্রন্থে বলেন, ‘ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা মহসিন উদ্দিন দুদু মিয়ার ছেলে বাদশা মিয়ার অনুসারী ছিলেন মমিন উদ্দিন আকন্দ। নিজ বাড়িতে কাঠ দিয়ে একটি মসজিদ নির্মাণের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। এ উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে কাঠের নানা নকশা দেখে নিজেই সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। স্বজনদের আর্থিক সহায়তায় ১৯১৩ সালে নির্মাণকাজ শুরু করেন। সে সময়ের বরিশাল অঞ্চলের কাঠশিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি থেকে হরকুমার নাথ নামে প্রসিদ্ধ এক মিস্ত্রিকে মাসিক ৪০ টাকা বেতনে মসজিদ তৈরির কাজের দায়িত্ব দেন। ২২ জন মিস্ত্রি সাত বছর ধরে কাজ করে ১৯২০ সালে শেষ করেন নির্মাণকাজ। মসজিদ তৈরিতে ব্যবহৃত কাঠ সংগ্রহ করা হয়েছিল মিয়ানমার, ত্রিপুরা ও আসাম থেকে।’

গ্রাম্য পরিবেশে গড়ে ওঠা মসজিদটির আশপাশটা বেশ নিরিবিলি। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি সুপারি গাছ। মসজিদের সামনে ছোট্ট পাকা বারান্দা। এর সীমানা ছোট্ট প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।

আনুমানিক ১২ ফুট প্রস্থ ও ২৪ ফুট দৈর্ঘ্যরে মসজিদের প্রতিটি ইঞ্চি অনন্য সব নকশায় ভরপুর। ভেতরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য পাটাতনের মাঝে তৈরি করা হয়েছে দুই স্তরে দোচালা টিনের ছাউনি। উত্তর ও দক্ষিণে দুটো করে এবং পূর্ব ও পশ্চিমে চারটি করে জানালা রয়েছে। পূর্ব দিকে রয়েছে একটি প্রবেশদ্বার। তাতে কারুকার্যখচিত দুটি পিলার। প্রবেশদ্বারের ওপরে বাঁ দিকে আরবি হরফে ক্যালিওগ্রাফিতে ইসলামের চার খলিফার নাম ও মাঝখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম অলংকৃত করা হয়েছে। প্রবেশদ্বারের মাঝামাঝি অংশে খোদাই করা হয়েছে ‘লা ইলাহা ইল্লালাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’। ভেতরে মেহরাবের ওপরও রয়েছে সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম ও ক্যালিওগ্রাফি।

পুরো মসজিদ তৈরিতে জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার এবং কাঠের ওপর সম্পূর্ণ প্রাকৃতির উপাদানের নৈসর্গিক রঙে আরবি ক্যালিগ্রাফির বৈশিষ্ট্য মমিন মসজিদকে বিশ্বে একক ঐতিহ্যে পরিণত করেছে। এর ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য বিবেচনা করে ২০০৩ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর এটিকে ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ ঘোষণা দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করে।

শুধু বাংলাদশ নয়, বিবিশ্বের সৌখিন মহলেও আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে মমিন মসজিদ। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ৩০টি শিল্প সম্পৃদ্ধ মসজিদের মধ্যে অন্যতম বলে ইউনেসকোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ইউনিসেফ প্রকাশিত বিবিশ্বের অন্যতম মসজিদ নিয়ে প্রকাশিত ৪০০ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে মমিন মসজিদের সচিত্র বর্ণনা রয়েছে। বাংলাদেশের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত মসজিদের মধ্যে যেগুলো বেশি গুরুত্ব বহন করে, সেসব মসজিদের ছবি জাতীয় জাদুঘরেও প্রদর্শিত হয়। মঠবাড়িয়ার এই মমিন মসজিদের কয়েকটি আলোকচিত্র বণর্ণনাসহ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

 

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

সাতক্ষীরায় যুব কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থানীয় কারিগরি ও বৃত্তিমুলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা শীর্ষক সংলাপ

দেশে কাঠের তৈরি একমাত্র মসজিদ

আপডেট সময় : ০৫:৩২:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ মার্চ ২০২৪

বরিশালের পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া থানার বুড়িরচর গ্রামে ১৯১৩ সালে নির্মিত হয় দৃষ্টিনন্দন একটি কাঠের মসজিদ। মূল নাম ‘মমিন মসজিদ’ হলেও স্থানীয়দের মাঝে ‘কাঠের মসজিদ’ নামেই প্রসিদ্ধ পেয়েছে। সম্পূর্ণ মসজিদ কাঠের তৈরি। এমনকি এতে কোনো লোহার উপাদান বা পেরেকও ব্যবহৃত হয়নি। লোহার পেরেকের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে কাঠের শলা। মসজিদটি দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, বিশ্বের একমাত্র কাঠের তৈরি দৃষ্টিনন্দন মুসলিম স্থাপত্য ও অনুপম নিদর্শন। সারা বিশ্বে এ ধরনের মসজিদ আর নেই বলে দাবি করেন স্থানীয়রা। পুরো কাঠের তৈরি আরেকটি মসজিদ ইরানের খোরাসানে থাকলেও তার বৈশিষ্ট্য কিছুটা ভিন্ন। এ ধরনের কাঠের তৈরি আরও একটি মসজিদ একসময় ভারতের কাশ্মিরেও ছিল; কিন্তু ১৮৮৫ সালের ভূমিকম্পে সেটি ধ্বংস হয়ে যায়। সে হিসেবে বলা যায় মমিন মসজিদ পৃথিবীর একক নিদর্শন।

দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন তৎকালীন পিরোজপুরের ধর্মপ্রাণ যুবক মৌলভী মমিন উদ্দিন আকন্দ। তার পৌত্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ রচিত ‘মমিন মসজিদ; স্মৃতি বিস্মৃতির কথা’ গ্রন্থে বলেন, ‘ফরায়েজি আন্দোলনের নেতা মহসিন উদ্দিন দুদু মিয়ার ছেলে বাদশা মিয়ার অনুসারী ছিলেন মমিন উদ্দিন আকন্দ। নিজ বাড়িতে কাঠ দিয়ে একটি মসজিদ নির্মাণের স্বপ্ন দেখতেন তিনি। এ উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে কাঠের নানা নকশা দেখে নিজেই সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। স্বজনদের আর্থিক সহায়তায় ১৯১৩ সালে নির্মাণকাজ শুরু করেন। সে সময়ের বরিশাল অঞ্চলের কাঠশিল্পের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি থেকে হরকুমার নাথ নামে প্রসিদ্ধ এক মিস্ত্রিকে মাসিক ৪০ টাকা বেতনে মসজিদ তৈরির কাজের দায়িত্ব দেন। ২২ জন মিস্ত্রি সাত বছর ধরে কাজ করে ১৯২০ সালে শেষ করেন নির্মাণকাজ। মসজিদ তৈরিতে ব্যবহৃত কাঠ সংগ্রহ করা হয়েছিল মিয়ানমার, ত্রিপুরা ও আসাম থেকে।’

গ্রাম্য পরিবেশে গড়ে ওঠা মসজিদটির আশপাশটা বেশ নিরিবিলি। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি সুপারি গাছ। মসজিদের সামনে ছোট্ট পাকা বারান্দা। এর সীমানা ছোট্ট প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।

আনুমানিক ১২ ফুট প্রস্থ ও ২৪ ফুট দৈর্ঘ্যরে মসজিদের প্রতিটি ইঞ্চি অনন্য সব নকশায় ভরপুর। ভেতরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য পাটাতনের মাঝে তৈরি করা হয়েছে দুই স্তরে দোচালা টিনের ছাউনি। উত্তর ও দক্ষিণে দুটো করে এবং পূর্ব ও পশ্চিমে চারটি করে জানালা রয়েছে। পূর্ব দিকে রয়েছে একটি প্রবেশদ্বার। তাতে কারুকার্যখচিত দুটি পিলার। প্রবেশদ্বারের ওপরে বাঁ দিকে আরবি হরফে ক্যালিওগ্রাফিতে ইসলামের চার খলিফার নাম ও মাঝখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নাম অলংকৃত করা হয়েছে। প্রবেশদ্বারের মাঝামাঝি অংশে খোদাই করা হয়েছে ‘লা ইলাহা ইল্লালাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’। ভেতরে মেহরাবের ওপরও রয়েছে সূক্ষ্ম শিল্পকর্ম ও ক্যালিওগ্রাফি।

পুরো মসজিদ তৈরিতে জ্যামিতিক নকশার ব্যবহার এবং কাঠের ওপর সম্পূর্ণ প্রাকৃতির উপাদানের নৈসর্গিক রঙে আরবি ক্যালিগ্রাফির বৈশিষ্ট্য মমিন মসজিদকে বিশ্বে একক ঐতিহ্যে পরিণত করেছে। এর ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য বিবেচনা করে ২০০৩ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর এটিকে ‘সংরক্ষিত পুরাকীর্তি’ ঘোষণা দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করে।

শুধু বাংলাদশ নয়, বিবিশ্বের সৌখিন মহলেও আলোচনায় স্থান করে নিয়েছে মমিন মসজিদ। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ৩০টি শিল্প সম্পৃদ্ধ মসজিদের মধ্যে অন্যতম বলে ইউনেসকোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ইউনিসেফ প্রকাশিত বিবিশ্বের অন্যতম মসজিদ নিয়ে প্রকাশিত ৪০০ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদনে মমিন মসজিদের সচিত্র বর্ণনা রয়েছে। বাংলাদেশের সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত মসজিদের মধ্যে যেগুলো বেশি গুরুত্ব বহন করে, সেসব মসজিদের ছবি জাতীয় জাদুঘরেও প্রদর্শিত হয়। মঠবাড়িয়ার এই মমিন মসজিদের কয়েকটি আলোকচিত্র বণর্ণনাসহ জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।